সোমবার, মে ২০, ২০২৪

ফেইসবুকের কল্যাণে ভারত থেকে এক যুগ পর বৃদ্ধাকে ফিরে পেলো তার পরিবার

জেলা প্রতিনিধি, শরীয়তপুর:

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে প্রায় এক যুগ পর জগুনা বিবি(৭০) নামের এক বৃদ্ধাকে ফিরে পেলেন তার পরিবার।

বুধবার (০১ মে)  সকালে সুদুর ভারতের কলকাতা থেকে যশোর বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার ডেঙ্গর বেপারী কান্দি নিজ বাড়িতে পৌঁছান তিনি।

বুূধবার দুপুরে সরেজমিনে জগুনা বিবির বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, তাকে পেয়ে পরিবারের সকল সদস্যরা খুবই উৎফুল্ল হয়ে আছেন। কেও তাকে খাবার খাওয়াচ্ছেন আবার কেউ তার পরিচর্যা করছেন। কিন্তু জগুনা বিবি অসুস্থতার কারনে কথা বলতে পারছেন না।

জগুনা বিবির পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে বিয়ে হয় জাজিরা ইউনিয়নের ডেঙ্গর বেপারী কান্দির লালমিয়া বেপারী ও জগুনা বিবি দম্পতির। এরপর দুজনের একসাথে কেটে যায় কয়েক যুগ। তাদের ঘর আলোকিত করে আসে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেমেয়ে বড় হওয়ার পর জগুনা বিবি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। তখন থেকে কাউকে কিছু না বলে মাঝেমধ্যেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন। পরিবারের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসতেন।

এরপর ২০১১ সালে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। স্বজনরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। এর পর কেটে যায় একযুগ।

গত মার্চ মাসে জাজিরা উপজেলার মাসুদ রানা নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডিতে কমেন্ট করেন কলকাতার মোবাইল-ফোন ব্যবসায়ী আজিজুল শেখ। তার কাছে প্রায় একযুগ ধরে জাজিরার একজন বৃদ্ধা আছে সেই খবর দেন মাসুদ রানাকে। এরপর মাসুদ রানা ‘প্রাণের জাজিরা’ নামক  একটি ফেসবুক গ্রুপে জগুনা বিবির একটি ছবি দিয়ে পোস্ট করেন। সেখান থেকেই খোঁজ মিলে জগুনা বিবির পরিবারের। এরপর পরিবারের লোকজন ভারতের কলকাতার আজিজুল শেখের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে গত (০১ মে) জগুনা বিবিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। 

জগুনা বিবিকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া যুবক মাসুদ রানা  বলেন, আমার ফেসবুকের একটি পোস্টে ভারতীয় নাগরিক আজিজুল শেখ নামের এক লোক আমার সাথে যোগাযোগের আগ্রহ দেখিয়ে কমেন্ট করেন। তারপর তার সাথে হোয়াটসএ্যাপে কথা হয়। তিনি কলকাতার চব্বিশ পরগনা জেলার বাসিন্দা। জানতে পারি তার কাছে জগুনা বিবি নামের একজন বৃদ্ধা আছে। এরপর তার সাথে কথা বলে সমস্ত তথ্য নিয়ে ‘প্রাণের জাজিরা’ নামক ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দেই। সেখান থেকেই জগুনা বিবির পরিবার আমার সাথে যোগাযোগ করে। এরপর তাদের সাথে কলকাতার আজিজুল শেখের সাথে কথা বলিয়ে দেই।

এ ব্যাপারে কথা হয় দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ফেদেরগঞ্জ থানার বিজয়ভাটি গ্রামের সোলাইমান শেখের ছেলে আশ্রয়দাতা আজিজুল শেখের সাথে। তিনি বলেন, গত ৮ বছর আগে আমার দোকানের সামনে জগুনা বিবিকে ভারসাম্যহীন ও অসুস্থ্য অবস্থায় পাই পরে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাই।

আজিজুল শেখ আরও বলেন, এই বুড়িমার চেহারার সাথে আমার মৃত দাদীর চেহারার মিল থাকায় আমি ও আমার পরিবার এবং আমার প্রতিবেশি নওশাদ আলী শেখ ও তার পরিবার দেখাশোনা ও সেবা যত্ন করি। এরপর গত ৪ মাস আগে তিনি বড় ধরণের একটি স্ট্রোক করেন। ভাবিনি তিনি বেঁচে ফিরবেন। তবে আল্লাহর বিশেষ রহমতে তিনি সুস্থ হোন। কিন্তু তিনি সুস্থ হওয়ার পর আমাদের কাউকেই আর চিনতে পারছিলেন না। তিনি তার ছেলে-মেয়ে ও আগের বাসস্থানের কথা বলতে থাকেন এবং সেখানে যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় আমি তার বলা ঠিকানা সহ তথ্য দিয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার মাসুদ রানা নামে এক তরুণের সাথে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানালে তিনি এই বুড়িমার পরিবারের সাথে আমাকে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। পরে আমরা তার সকল তথ্য উপাত্ত দিয়ে বাংলাদেশ হাই কমিশনের কাছে আবেদন করলে অনুমতি পাওয়ার পর বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তাকে বাংলাদেশে তার পরিবারের কাছে পাঠাতে সক্ষম হই।

আজিজুল শেখ বিস্তারিত জানানো শেষে আবেগ আপ্লুত হয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, এই বুড়িমা আমাদের সাথে অনেকদিন থাকার কারনে তার প্রতি অনেক মায়া জন্মেছে। আমার পরিবারের ছোটবড় সকলে তাকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু সে তার পরিবারের কথা মনে পড়ার পর থেকে পরিবারের সাথে দেখা করতে চাচ্ছিলেন। তাই আর ধরে রাখতে পারলাম না। তবে অনেক ভালো লাগছে একজন শেষ বয়সী মানুষকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে। আল্লাহ তাকে সবসময় সুস্থ রাখুক। আমরা শিঘ্রই তার সাথে দেখা করতে যাবো।

জগুনা বিবির স্বামী লালমিয়া বেপারী বলেন, আমার স্ত্রী হারিয়ে যাওয়ার পর আমরাসহ আমাদের আত্মীয়-স্বজন সকলেই বিভিন্ন স্থানে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। একপর্যায়ে তাকে খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আল্লাহর রহমতে আমরা তাকে আবারো খুঁজে পেয়েছি।  আপনারা সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

এ ব্যাপারে জগুনা বিবির ছেলে জয়নাল বেপারী  বলেন, মা নিখোঁজ হওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। অনেক দিন পর মাকে খুঁজে পেয়ে আমরা ভাইবোন ও আমাদের ছেলেমেয়েরা সবাই  খুব খুশি। সবার দোয়া চাই, সেবাযত্ন করে যেন মাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলতে পারি।

পাসপোর্ট বিহীন ভারত থেকে কিভাবে বাংলাদেশে আসার সুযোগ পেলেন জানতে চাইলে বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: আজহারুল বলেন, যাদের পাসপোর্ট হারিয়ে যায় কিংবা কোন কারনে কেউ পাসপোর্ট বিহীন অন্য দেশে প্রবেশ পরে কিন্তু কোন অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িত নয় এমন ব্যক্তিদের দুই দেশের সরকারের সংশ্লিষ্টদের সময়ন্বয়ে আউটপাস বা ট্রাভেলপাসের মাধ্যমে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা বা নেওয়া যায়।

জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া ইসলাম লুনা  বলেন, দীর্ঘ এক যুক পরে তিনি পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। এটি অত্যন্ত খুশির সংবাদ।  জগুনা বিবি যদি অসুস্থ্য থাকেন প্রয়োজনে আমরা তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। তার যদি কোনো সাহায্য সহযোগীতার দরকার হয় তাহলে আমরা  তাকে সাহায্য করবো তার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য।

- Advertisement -spot_img
- Advertisement -spot_img
আরও
- Advertisement -spot_img