
আজ ৩ আগস্ট। বাংলাদেশের বিজ্ঞান, উচ্চশিক্ষা ও উন্মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. এম. শমশের আলী স্যারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি শুধু বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য নন; তিনি ছিলেন একজন বিশ্বমানের তাত্ত্বিক পরমাণু পদার্থবিজ্ঞানী, বিজ্ঞান-জনপ্রিয়করণ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এবং উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের দূরদর্শী স্থপতি।
স্যারকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
জন্ম ও শিক্ষা:
৯ নভেম্বর ১৯৩৭ সালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় জন্মগ্রহণ করেন। যশোর জেলা স্কুল থেকে এসএসসি, রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে সম্মান ও ১৯৬০ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে তাত্ত্বিক পরমাণু পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি লাভ করেন।
কর্মজীবন ও নেতৃত্ব:
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে (১৯৬১–১৯৮২) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন।
ঢাকা অ্যাটমিক এনার্জি সেন্টারের পরিচালক (১৯৭০–১৯৭৮)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (১৯৮২–২০০৬) এবং আজীবন সম্মানসূচক অধ্যাপক।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য (১৯৯২–১৯৯৬)।
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য (২০০২–২০১০)।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির সভাপতি (২০০৪–২০১২)।
TWAS (The World Academy of Sciences)-এর ফেলো ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাউবিতে তাঁর অবদান বাংলাদেশে উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব মূলত তাঁর। তাঁর নেতৃত্বে—
বাউবির একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্কুল, অনুষদ, আঞ্চলিক কেন্দ্র, উপ আঞ্চলিক কেন্দ্র ও স্টাডি সেন্টারের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
মুদ্রিত স্বশিক্ষণ উপকরণ:
তার নেতৃত্ব ও সুদূরপ্রসারী চিন্তায় রেডিও-টেলিভিশনভিত্তিক শিক্ষা এবং বহুমাধ্যমভিত্তিক দূরশিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়।
কর্মজীবী, গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এবং ঝরে পড়া মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত হয়। শুরু হয় শিক্ষায় আগ্রহী ও ঝরে পড়া মানুষের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন।
বাউবি এখন মেগা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী সংখ্যা তিন লক্ষাধিক। ০৭ স্কুল, ১১ টি বিভাগ, ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০ টি উপ আঞ্চলিক কেন্দ্র, ১৫০০ এর অধিক স্টাডিসেন্টারের সমন্বয়ে বিশাল বাউবি পরিবার।
গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক অবদান ড. শমশের আলী ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তাত্ত্বিক নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণার ফল হিসেবে Ali–Bodmer Potential বিশ্বব্যাপী নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত একটি তাত্ত্বিক মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক জার্নালে শতাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং দেশের বিজ্ঞানচর্চাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
প্রকাশনা:
তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্কতা, বিজ্ঞান ও ধর্ম, শিক্ষা এবং সমাজ-উন্নয়ন বিষয়ক অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ ও বই রচনা করেন। তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা শতাধিক; বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ও TWAS–এর জীবনবৃত্তান্তে তাঁর প্রকাশনার পৃথক তালিকা সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি উন্মুক্ত শিক্ষা নিয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র “The Bangladesh Open University: Mission and Promise” আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়, যা বাউবির দর্শন ও লক্ষ্য বিশ্বপরিসরে তুলে ধরে।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হরিপ্রসন্ন রায় স্বর্ণপদক।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদক।
খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ স্বর্ণপদক।
TWNSO–ROCASA Award (বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে অবদানের জন্য)।
Lifetime Achievement Award in Higher Education Leadership (মালয়েশিয়া, ২০০৯)।
BAS–Dr. Innas Ali Memorial Gold Medal (আজীবন অবদানের স্বীকৃতি, ২০২৫)।
প্রফেসর ড. এম. শমশের আলী ছিলেন এমন এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব, যিনি বিজ্ঞানকে গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ রাখেননি; শিক্ষা, সমাজ, নৈতিকতা এবং মানবকল্যাণের সঙ্গে বিজ্ঞানের সংযোগ ঘটিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আজ লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণের ঠিকানা।
বাউবির একজন সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ঋণ চিরদিনের। তাঁর কর্ম, দর্শন ও আদর্শ আমাদের পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর উছিলায় কয়েক হাজার মানুষের হালাল রুজির ব্যবস্থা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে সমাজের সর্বত্র আলোর দ্যূতি ছড়াচ্ছে।
মহান আল্লাহ তাআলা মরহুম প্রফেসর ড. এম. শমশের আলী স্যারকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।
ড. মোঃ আজিজুল হক
আঞ্চলিক পরিচালক (পিআরএল)
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
সেক্রেটারি টু বোর্ড অব ট্রাস্টি
ইন্টারন্যাশনাল ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বাংলাদেশ